স্বাধীনতা কে অর্থহীন বলা, স্বাধীনতা কে অস্বীকার করার নামান্তর

[গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা]

বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালী জাতি আজ স্বাধীন, সার্বভৌম একটি জাতি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে, ৩০ লক্ষ শহীদ ও অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে তা অর্জন করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। তাদের লক্ষ্য ছিল, শোষণ ও অপ-শাসনের অবসান ঘটিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলার প্রতিষ্ঠা। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে দেশকে স্বাধীন করবার প্রচেষ্টায় এত মানুষের আত্মদানের ইতিহাস বাঙালী জাতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য আত্মাহুতি পর্ব থেকে শুরু করে, ১৯৬৯ সালের গণ-জাগরণ, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃফুর্ত অংশগ্রহণে, বাঙালী জাতির বেশীর ভাগ মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির যুদ্ধে। লক্ষ্যে তারা অটল ও সঠিক ছিলেন বলেই মাত্র কয়েক মসের যুদ্ধে দখলদারদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে তারা বাঙালী জাতির বহুল প্রত্যাশিত স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিলেন, যে স্বাধীনতার জন্য জাতি অপেক্ষা করছিল প্রায় দুই শত বছর যাবত। জাতির দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা বা নিজেদের নিজ দ্বারা শাসন করবার প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জনে, তাদের আত্মত্যাগ বা কর্মপন্থা নির্ধারণে তাদের কোন ত্রুটি ছিল না। তাহলে ইদানীং কিছু সুশীল লেখক (!) ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (যখন যারা ক্ষমতার বাইরে থাকেন) হরহামেশা কেন অভিযোগ তুলে বলছেন যে, স্বাধীনতা অর্থহীন, রক্তদান অর্থহীন, ভাষার জন্য আত্মাহুতি-এসব অর্থহীন বা বেহুদা বক্ওয়াস ?

এসব সুশীল লেখকরা সুকৌশলে ও সু-দক্ষ লেখনীতে হালের কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে বাহানা বানিয়ে স্বাধীনতা-সংস্কৃতির বিপক্ষে বলে চলেছেন । বিবদমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে প্রমাণ হিসাবে সামনে তুলে ধরে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এটা বোঝাতে ও প্রমাণ করতে চাইছেন যে, আমরা অতীতের ন্যায় এখনো পরাধীন, শৃঙ্খলিত। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগ বৃথা, বাঙালী জাতীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ অর্জনই অর্থহীন। যখন তারা আজকের ঘটনাবলীর জন্য তাদের দিকে পরোক্ষ ভাবে অভিযোগের তীরটি ছুঁড়ে মারছেন, তখন স্বাভাবিক ভাবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে-
তারা কি চলমান সংকট ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চান বা সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে চান?

কিছু সুশীল (!) লেখক আছেন যারা স্বভাবজাত ভঙ্গিতে কারণে-অকারণে, উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে সমাজের বেশী বেশী নেগেটিভ ধারণা বা বিষয়কে তুলে আনছেন । এমন কি জাতির বিশেষ দিবস গুলির আগে পিছে তারা সুকৌশলে ও সংঘবদ্ধভাবে জাতিকে ঐক্যের জায়গা থেকে মুখ ফিরাতে, জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি বিমুখ করে তোলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন। তারা আমাদের ইতিহাস-সংস্কৃতির বর্তমানের বিভিন্ন ত্রুটিপূর্ণ দিক তুলে ধরে সব হারিয়েছি বলে হাহাকার করতে শুরু করেন, এবং এর ফাঁকে তারা মহান স্বাধীনতা সহ বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে পরোক্ষভাবে কটূক্তি ও উপহাস করতে শুরু করেন। লেখনীর মধ্য দিয়ে তারা জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করে বোঝাতে চান যে, এত বছরেও স্বাধীনতা অর্থবহ হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পত্র-পত্রিকার স্বাধীনতাকে অর্থহীনতা প্রমাণ করার জন্য তারা ক্ষুরধার লেখনীতে পাতা ভরে শুধু লিখে চলেছেন। তাদের লেখার বিভ্রান্তিতে পড়ে নতুন প্রজন্মের সাধারণ পাঠকরা যার পর নাই বিভ্রান্ত।

একটু বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, কিছু সম্ভাবনাময় মেধাবী লেখক মন্দ রাজনীতির খপ্পরে পড়ে মুক্ত জ্ঞান চর্চার বদলে, কোন গোষ্ঠী বা আদর্শের ধারক-বাহক হয়ে যা ইচ্ছে তাই লিখে যাচ্ছেন বা অনর্গল বকবক করে বকে চলেছেন। হালের জাতির মধ্যে বিভেদ বা অনৈক্য প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকা চোখে পড়ার মত। তারা তাদের কার্যকলাপে জাতির মধ্যে কেবল অনৈক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছেন না তারা প্রকারান্তরে স্বাধীনতা উত্তর কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে বাহানা হিসাবে ব্যবহার করে, স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার মত ঘটনা ঘটাচ্ছেন।

SHARE ON
RELATED POSTS

মন্তব্য করুন