সমসাময়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ধর্ম ও ভাষার প্রভাব-২

জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলো এক-একটি ভিন্ন হলেও,  যখন তারা একে অন্যের উপর প্রাধান্য লাভের উদ্দেশ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হয়, তখন জাতীয়তার কোন একটি উপাদান অতি শক্তিশালী হয়ে অন্য এক বা একাধিক উপাদানকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, এবং শেষে তা বিজয়ী হয়ে অন্য উপাদানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

উনিশশো সাতচল্লিশে দেশভাগের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের যে উপাদানটি পরিশেষে বিজয়ী হয়, তা হল ধর্ম। যদি কোন একটি অঞ্চলের বেশীরভাগ মানুষের ধর্মগত ঐক্য থাকে, তাহলে তারা পরস্পরকে এক ও অভিন্ন ভাবতে শুরু করে এবং এ ভাবনাটিকে যদি তারা ঐকান্তিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তারা একদিন স্বাধীন জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান বিভাজনে রক্ত-বংশ, ভাষা, পারস্পরিক নৈকট্য ইত্যাদি যত না জনসাধারনকে প্রভাবিত করেছিল, তার চেয়ে বেশী প্রভাবিত করেছিল জাতীয়তার অন্যতম সক্রিয় উপাদান বেশীরভাগ মানুষের ধর্ম।

খৃষ্টপূর্ব যুগে গ্রীক নগর রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সম-সাময়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সহ সকল প্রকার রাজনৈতিক আলোচনায় ধর্মীয় চিন্তা-চেতনার প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট ও চোখে পড়ার মত। মহান দার্শনিক সক্রেটিসকে তৎকালীন এথেন্সের সরকার যে মিথ্যে অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তা ছিল ধর্ম সম্পর্কিত। অভিযোগ ছিল,  তিনি নাকি এথেন্সের মানুষকে একত্ববাদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছিলেন। মধ্য যুগের রাজনীতিতেও জাতীয়তাবাদের ধর্মীয় উপাদানের ছিল জয়-জয়কার। যদিও সম-সাময়িক শিল্পসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিতে ধর্মের বাহুল্যতা খুব বেশী চোখে পড়ে না,  তবে এখন বেশীরভাগ রাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্ম প্রধান ভূমিকা পালন করে চলেছে।

জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলো যেহেতু একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে সেহেতু কোন একটি উপাদানের প্রাধান্য বেশী দিন টেকে না। সেখানে কিছু দিনে মধ্যেই চিড় ধরে। বেশীরভাগ মানুষের ঐক্যের জায়গায় ফাটল সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে যখন জাতীয়তার অন্য একটি উপাদান সক্রিয় হয়ে মূল উপাদানের স্থান দখলের চেষ্টা করে তখন সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। তৎকালীন সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ঐক্যের জায়গাটিতে প্রথম আঘাত আসে ভাষার দিক থেকে এবং দ্বিতীয় আঘাত আসে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডগত দিক থেকে। পাকিস্তানের বেশীরভাগ মানুষের ধর্মগত দিক থেকে ঐক্য বা এক ভাবার জায়গা থাকলেও ভাষার দিক থেকে তারা ভিন্ন ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বেশীরভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বললেও, পশ্চিম পাকিস্তানের সকল মানুষের ভাষা উর্দু ছিল না। সেখানেও ভাষাগত ঐক্য ছিল না। এই ভাষাগত ঐক্য হীনতার প্রথম, প্রবল ও সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালে পূর্বপাকিস্তানের জনসাধারণের মধ্যে। ভাষার দাবী প্রতিষ্ঠায় যখন বেশীরভাগ মানুষ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখন জাতীয়তাবাদের ভাষাগত উপাদান অধিক পরিমাণে সক্রিয় হয়ে ধর্মীয় উপাদানকে পরাজিত করে, জাতির এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয় সূচিত করেছিল। বাঙালী জাতি নতুন পরিচয়ে এবং ভাষার ঐক্যে বলিয়ান হয়ে ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে, বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তৎকালীন জনপ্রতিনিধি কর্তৃক যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল তাতে কোন একটি ধর্মের একক প্রাধান্য খর্ব করে সকল ধর্মের উপর সমান গুরুত্ব দিয়ে ধর্মণিরপেক্ষতাকে সাংবিধানিক মূলনীতি করা হয়েছিল। সকল বাঙালীর ধর্মগত দিক থেকে যেহেতু ঐক্য ছিল না সেহেতু ভাষাগত ঐক্যের দিককে বাংলাদেশের সংবিধানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

(চলবে—)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।