মৃত্যু ভয় ও ধর্ম | Fear of death and religion

মৃত্যু ভয় ও ধর্ম

“মরিতে চাইনা আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”-কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাব্য করে মানুষের মৃত্যু ভয় নিয়ে যে কথা বলেছেন, তাতে করে এটা সহজে অনুমেয় যে, মানুষ মাত্রেই বেঁচে থাকতে চায়, মৃত্যুতেই তার যত আপত্তি!

’জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা ভবে’ -কথাটি যে যত সাহসের সাথে বলুক না কেন, মানুষ তার মৃত্যু নিয়ে ভাবনা ও মৃত্যুজনিত পরিস্থিতিতে মৃত্যু ভয় সর্বদা তাকে ভীত করে তোলে। মানুষের এই মৃত্যু ভয় ও মরণশীল চরিত্রের কারণেই বেশীরভাগ মানুষ মৃত্যুর পরেও অনন্ত জীবনের প্রত্যাশায়, ধর্মের কাছে অনুগত থেকেছে সৃষ্টি আদি কাল থেকে।

ধর্ম যদিও মানুষকে তার মৃত্যু ভয়, ভাল কাজের মধ্য দিয়ে জয় করতে শিখিয়েছে, সাথে-সাথে মন্দ কাজের পাপ বা পাপবোধ মানুষকে মৃত্যু ভয়ে ভীত করেছে সবসময়।

যদিও জীবিত প্রাণীর জীবন নামক ধারণার জন্য মৃত্যু অপরিহার্য, তবুও একমাত্র চিন্তাশীল জীব হিসাবে মানুষ তার নিজের মৃত্যুকে সহজে বরণ করতে চায় না। এমন কি, মৃত্যুকে যারা জীবনের একেবারেই শেষ না বলে শুরু বলতে পক্ষপাতি, তারাও পর-জাগতিক সুখের মায়া ত্যাগ করে, ইহকালে যতদূর সম্ভব দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চায়।

ইহ-জাগতিক জীবন ছেড়ে মানুষ নিশ্চিত পর-জাগতিক জীবনে যেতে চাইলে, ধর্ম নির্দেশীত পথ যথাযথভাবে অনুসরণ করে সহজে সে তা লাভ করতে পারে। মৃত্যুতে মানুষ ভীত না হলে, ক্ষণস্থায়ী জীবন ছেড়ে নিশ্চিত অনন্ত জীবনে প্রবেশে তাহলে এত ভয় পাবার কথা নয়।

আর পর-জাগতিক জীবনকে যারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন বা স্রষ্টা আদৌ আছে বলে যারা স্বীকার করেন না, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো মন্দ বা অনুচিত কর্মের অনুশোচনাও মৃত্যু ভয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।

আবার যারা সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকারের পাশাপাশি পাপ কোন কর্মে লিপ্ত থাকেন, তখন হয়তো সৃষ্টিকর্তার রোষানলে পড়ার ভয় থেকে  মানুষের মৃত্যু ভয় আসতে পারে।

মৃত্যু বা মৃত্যুকে চিন্তা মধ্য দিয়ে অনুধাবন করতে মানুষ যতটা ভয় পায়, ততটা ভয় সে তার জীবদ্দশায় অন্য কোন কিছুকে পায় কী না- তা নিয়ে যে কেউ বিতর্ক করতে চাইলেও, মৃত্যুভয়কে ধর্মের পর-কালীন সুখ বা নিশ্চিত জীবনও জয় করতে পারে নি -একথা জোর দিয়ে বলা যায়।

সৃষ্টির আদি কাল থেকে মৃত্যু ভয় দ্বারা মানুষ যে সব সময় তাড়িত হয়ে এসেছে তার বড় প্রমাণ পায়, উত্তরোত্তর চিকিৎসা সেবার বহুল প্রসারের মধ্য দিয়ে।

অন্যদিকে স্রষ্টা প্রদত্ত ধর্মগুলোর অস্তিত্বও প্রমাণ করে যে, মানুষ স্রষ্টাকে খুশী করে মরেও অমর হতে চায়। এত কিছু করেও যখন মানুষের অ-মরণশীল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তখন সহজাত কৌতূহলী মনে সহজেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেনই বা মানুষের এত মৃত্যুভয়? ধর্ম কী এর একমাত্র কারণ?

মৃত্যু যে কেবল জীবনেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ- তা কিন্তু নয়, বরং সেটা ধর্মেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কার্যত বিশ্বের বহুল প্রচলিত ধর্মমত গুলো মানুষের মৃত্যু ও পরকালীন শাস্তি-পুরস্কারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

মানুষের পরকালীন জীবনের চিন্তা বা পাপ-পূণ্যের ভাবনাটির পিছনে যে বিষয়টি কাজ করেছে, তা হল মৃত্যু ও মৃত্যুজনিত ভয়। মৃত্যুভয় হল, এক প্রকার শূন্যতার অনুভব যা মানুষ চিন্তা ও কল্পনা করতে ভয় পায়।

মানুষের শূন্যতার এই ভয়কে দূর করতে ধর্ম আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষকে ধর্ম এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে, ভাল কাজের পুরস্কার হিসাবে তাকে মৃত্যুহীন অনন্ত জীবন সাথে সাথে দেওয়া হবে যাবতীয় সুখ ও শান্তি। কিন্তু তাকে এটা বলেও হুশিয়ার করা হয়েছে যে, মন্দ কাজের শাস্তি হিসাবে অনন্ত জীবনের সাথে দেওয়া হবে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি।

বিশেষত, পরকালীন পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি যেহেতু মানুষের এই জগত ও জীবন সীমার বাইরে বা এটা নিশ্চিত নয় যে, তিনি পুরস্কার পাবেনই, তাই একজন ধার্মিক ব্যক্তিও অ-ধার্মিক ব্যক্তির মত অনিশ্চয়তা ও শংকাতে ভোগেন, যার পরিনতিতে মৃত্যুভয়ে ভীত হন।

ধর্মের পরকালীন পুরস্কারের আশায় মানুষ যেমন মৃত্যুভয়কে কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকে, তেমন মন্দ কাজ ও তার অনুশোচনা জনিত কারণে শাস্তির মুখোমুখি হতে ভয় পায়। মানুষ যখন মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তার শাস্তির ভয়াবহতা কল্পণা করে, তখনই মৃত্যু ভয় তাকে জেঁকে ধরে।

তাছাড়া পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি যেহেতু সকলের কাছে নিশ্চিত বলে মনে হয় না, সেহেতু এখানেও খটকা থেকে যায়। ভাল কাজের পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টিতেও যখন সকল ধর্মমত একমত পোষন করে না, তখন ধর্মও মানুষের মৃত্যু ভয় পুরোপুরি দূর করতে পারে না। তাই নিশ্চিত জীবন ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনে প্রবেশ  মানুষের এত ভয়।

আরো পড়ুন:

মৃত্যু: জীবনের সমাপ্তি, না অসীম যাত্রার শুরু?

বিশ্বাসের বিরোধিতা ও ধর্মে-ধর্মে ব্যবধান

উপাসনার ভিন্নতা ও ধর্মে-ধর্মে ব্যবধান

Share This

About Pramanik Jalal Uddin

লেখক, অধ্যাপক ও সৌখিন ওয়েব ডেভলপার। শিক্ষকতা প্রধান পেশা হলেও, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখালেখি করেন। শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষি ও প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহের লক্ষ্যে, GramBangla24.ComBD Educator ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেন।

View all posts by Pramanik Jalal Uddin →

মন্তব্য করুন