উপাসনার ভিন্নতা কি ধর্মে-ধর্মে ব্যবধান সৃষ্টি করছে?

মানুষ জন্মে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন না হলেও অন্তত জীবনের কিছু সময়, তারা তাদের সৃষ্টিকর্তাকে খুশী করার উদ্দেশ্য ও জাগতিক-পরজাগতিক কল্যাণের লক্ষ্যে, তাঁর উপাসনায় লিপ্ত থেকেছে , যারা স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। আর যারা প্রচলিত ধর্মমত ও স্রষ্টায় বিশ্বাসী নন, তারা এ বিষয়টি সম্পর্কে চরম উদাসীন থেকেছে সব সময়। তবে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে না যে, কেবল স্রষ্টায় বিশ্বাসী বা স্রষ্টার উপাসনাকারীদের দ্বারাই জাগতিক সকল কল্যাণ সাধিত হয়েছে। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস একদিকে যেমন জাগতিক ও পরজাগতিক কল্যাণ বয়ে এনেছে, অন্যদিকে তেমন ধর্ম-বিশ্বাস ও উপাসনার ভিন্নতার জন্য ভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে পারস্পরিক হানাহানিও কম হয় নি।

প্রতিটি ধর্মেরই কিছু না কিছু স্রষ্টা প্রদত্ত ও নির্দেশীত নির্দিষ্ট বিধি বা নিয়ম থাকে, যা ঐ ধর্মের প্রতি অনুগত সবাইকে অবশ্যই মেনে চলতে হয়। ধর্মের বিবি-বিধানগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, স্রষ্টার বিধানগুলোর মধ্যে কিছু বিধি বা নিয়ম এমনই যে, তা মানব আচরণকে তাঁর নির্দেশীত পথে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্য নির্দেশীত, বা মানব জাতি রক্ষা ও কল্যাণের জন্য পরিচালিত, এবং প্রতিটি মানুষের জাগতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও সেটা অবশ্যই পালনীয়। মানব জাতির অস্তিত্ব ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, মানুষকে জীবনযাপনের নিয়ম হিসাবে এগুলোকে মেনে চলতে হয়। যাতে করে স্রষ্টার নিয়ম বা নির্দেশনা মানার সাথে সাথে জাগতিক কল্যাণ সাধিত হয়। এ বিধিগুলো বর্তমান জগত ও জীবনের কল্যাণের উদ্দেশ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ধর্মের এই বিধিগুলো মানব জাতির সৃষ্টির সময় থেকে অদ্যাবধি প্রভূত কল্যাণ সাধন করে চলেছে। মিথ্যা, চুরি, খুন, ব্যভিচার সহ আরও অনেক ক্ষতিকর ও মন্দ আচরণ যা মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক নয় , তা কোন ধর্ম কোন কালেই স্বীকার করে নি বলেই হয়তো কোটি-কোটি মানুষ এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছে। মানব জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় ধর্মের মানবকল্যাণমুখী বিধিগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে ধর্মের কিছু বিধি বা নিয়ম মানব সমাজকে রক্ষা করেছে, যেমন করে বেড়া ফসলকে তৃণভোজী ও অন্যান্যদের হাত থেকে রক্ষা করে।

ধর্মীয় কিছু বিধি বা নির্দেশনায় নির্দিষ্ট কিছু উপাসনার কথা বলা হয়েছে, যা স্রষ্টাকে প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন ও তাঁকে খুশী করবার জন্য তা পালন করতে হয় এবং সেটা স্রষ্টার সাথে মানব জাতির আত্মিক যোগাযোগ ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস রক্ষায় অতি প্রয়োজনীয়। স্রষ্টাকে স্মরণ করার লক্ষ্যে নিছক উপাসনা জাগতিক কল্যাণের সাথে সরাসরি জড়িত না হলেও তা অবশ্যই পালনীয়। এখানে স্রষ্টা যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানো এবং স্রষ্টার করুণা বা দয়া লাভ করা যার প্রধান উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, স্রষ্টার নির্দেশীত বিধির মধ্যে কিছু বিধি তাঁর প্রতি বিশ্বাসের প্রমাণ স্বরূপ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালন করতে হয়। উপাসনালয় বা অনুরূপ স্থানে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খুশী করার জন্য, বিধিসম্মত উপায়ে যা করা হয় বা পালন করা হয় তা উপাসনা। ধর্মের এরূপ বিধি বা উপাসনার ক্ষেত্রে মানুষের জাগতিক কল্যাণের চেয়ে আত্মিক ও পরজাগতিক কল্যাণই বেশী নিহিত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ধর্মীয় বিধি বিধানগুলোর কিছু বিধি বা নিয়ম আছে যা মানব আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে কাজ করেছে, যাতে করে মানব জাতি যুগে যুগে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ভাল ও ন্যায়ের পথে। স্রষ্টা নির্দেশীত নিয়ন্ত্রিত আচরণে একদিকে মানুষ যেমন জাগতিক কল্যাণ লাভ করেছে, তেমন স্রষ্টার নির্দিষ্ট উপাসনার মধ্যে দিয়ে মানুষ স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের চেষ্টায় আত্মিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। জাগতিক কল্যাণের সাথে যদি আত্মিক কল্যাণের কথা ভাবা হয়, তাহলে তা সর্বোতভাবে কল্যাণকর হবে-এমনটি ভাবা যায়। কিন্তু নিছক ব্যক্তির আত্মিক ও পরজাগতিক কল্যাণের উদ্দেশ্যেই যদি স্রষ্টার উপাসনা করা হয়, তাহলে সে উপাসনার দ্বারা কি কোন জাগতিক কল্যাণ সাধিত হয়? বা এর কি কোন মূল্য আছে?

নিছক উপাসনা মধ্যে কেউ আত্মিক সুখ লাভ করলেও করতে পারে। কিন্তু মানব সমাজের জীবনযাপনের পদ্ধতি হিসাবে উপাসনার বাইরেও যে বিধি বা নিয়মগুলো আছে, যার দ্বারা মানব সমাজের সর্বোতভাবে ও সরাসরি কল্যাণ সাধিত হয়, তা পালন না করলে ধর্মীয় উপাসনাগুলি অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়। নিছক উপাসনা শুধু ধর্মের অর্থহীনতাই প্রকাশ করে না বরং তা ভিন্ন ধর্মের সাথে তার বৈপরীত্য বাড়ায়। জীবনযাপনের পদ্ধতি হিসাবে যে বিধি-বিধান মানব সমাজের আচরণ ও কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে এতদূর নিয়ে এসেছে, যা সকল মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অধিক সহায়ক ও কল্যাণকর বলে তা সব ধর্মেই এক ও অভিন্ন। কিন্তু বিভিন্ন ধর্মের উপাসনাগুলির মধ্যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ভিন্নতা ও বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। একটি ধর্মের সাথে অন্য একটি ধর্মের মধ্যে যত না মূলনীতি বা আদর্শে ভিন্নতা থাকে, তার চেয়ে বেশী ভিন্নতা প্রকাশ পায় উপাসনার ধরণের ভিন্নতা বা পদ্ধতির জন্য। আর উপাসনার ভিন্নতা ও ভিন্ন পদ্ধতির জন্য ধর্ম মানুষকে যেমন এক ধর্মের মানুষ থেকে অন্য ধর্মের মানুষকে পৃথক করে রেখেছে, তেমন ধর্মে-ধর্মে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে, যুগে যুগে মানব সমাজে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ছড়িয়ে দিয়েছে।

সৃষ্টি আদি কাল থেকে কিছু মানবকল্যাণমুখী ধর্মীয় বিধি বা নিয়ম যেমন একদিকে ফসল রূপ মানব সমাজকে খেতের বেড়া হয়ে রক্ষা করেছে, তেমন নিছক উপাসনা বা উপাসনার ধরণের ভিন্নতার জন্য তারা পরস্পর পরস্পরকে দূরে ঠেলেছে। যার পরিণতিতে কখনো বা তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। ধর্মের কাছ থেকে মানব সমাজ যা পেয়েছে তাতে করে তারা তাদের অস্তিত্ব আজও টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর উপাসনার ভিন্নতা বা নিছক লোক দেখানো উপাসনার উপর জোর দিতে গিয়ে মানুষ যা কিছু হারিয়েছে তা যদি হারাতে না হত, তাহলো পৃথিবীটা আরও বেশি সুন্দর ও সকলের জন্য কল্যাণকর হতে পারতো।

[লেখায় বিভিন্ন ধর্মের প্রতীকী যে চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত]

মতামত (2)

  1. ধন্যবাদ, অনেক সুন্দর একটি লেখার জন্য। আমার মতে উপাসনার পার্থক্য ধর্মে ধর্মে ব্যবধান আনে না। কারণ, প্রায় সব ধর্মের উপাসনার মমার্থ প্রায় এক। ব্যবধান আনে বিশ্বাসে।

    1. লেখায় অভিমত যুক্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
      ভাল থাকবেন।
      শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।