ভাষার মাসে ভাষা-সংস্কার: প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ভাষা যে বিষয়টির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হল চিন্তা। ভাষার মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের চিন্তাকে প্রকাশ করি। এ ক্ষেত্রে চিন্তা ভাষার পূর্বগামী। আমরা আমাদের চিন্তাকে প্রকাশ করার জন্য যে ভাষার সাহায্য গ্রহণ করি,  তা যদি ভালভাবে প্রয়োগ করতে পারি তবেই আমাদের পক্ষে সঠিক চিন্তার প্রকাশ ঘটানোর সম্ভব। আমরা যখন চিন্তা, কল্পনা বা অন্য কিছু করি বা ভাবি তখন তা ভাষার দিয়েই করি বা ভাবি। অর্থাৎ চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমরা সাধারণত: মা-বাবার ভাষাতেই আমাদের চিন্তাকে সহজ, সঠিক ও সুচারুরূপে প্রয়োগ করতে পারি, অন্য যে কোন বি-জাতীয় ভাষায় তা পারি না। কারণ বহুবিধ। মা-বাবার ভাষা-সান্নিধ্যে থেকে-থেকে আমরা অনেকটা অজ্ঞাতসারে তাদের ভাষা শিখে ফেলি সহজেই। বি-জাতীয় ভাষা শিখতে হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোন শিক্ষা বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে। শেখাটা যে সহজসাধ্য কাজ নয় তা ভুক্তভোগীরা জানেন। আমরা যদি আমাদের চিন্তাগুলোর প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ভাষাকে বিবেচনা করি,  তাহলে তা আমাদের মা-বাবার ভাষাতেই হওয়া জরুরী। কারণ তা জানতে ও শিখতে বহু শ্রম খরচ করতে হয় না। তাহলে আমরা এক্ষেত্রে জোর দিয়ে বলতে পারি যে, মা-বাবার ভাষার মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের চিন্তাকে সহজে প্রকাশ করতে পারি এবং তা সহজও সহজলভ্য।

আমাদের মা-বাবার ভাষা গ্রহণের অধিকার কিছুদিন আগ পর্যন্ত ছিল না। আমাদের শাসকমন্ডলী যারা ছিলেন, তারা বেশীরভাগ বাইরে থেকে এসে আমাদের শাসন ও শোষণ করেছেন, এবং তারা তাদের সুবিধার্থে বেশীর ভাগ সময়ে নিজ ভাষা ‘রাজভাষা’ করেছে বা করার চেষ্টা করেছে। আমরা তাদের ভাষা শিখেছি বা এখনও শিখছি অনেকটা বাধ্য হয়ে, কাজ চালানোর জন্যে। আমরা অতীতে বেশীরভাগ সময় ভাষা বৈষম্যের স্বীকার হয়েছি। এ ভাষা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে আমরা প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিলাম, রক্ত দিয়ে কিনতে হয়েছিল মা-বাবার মুখের ভাষার অধিকার। রক্ত দিতে হয়েছিল সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ অনেককে।

রক্ত দিয়ে ভাষার অধিকার অর্জনের পরেও আমাদের মা-বাবার ভাষার (বাংলা) যে কী গোলমেলে করুণ হাল হয়েছে, যা চিন্তার সঠিক প্রকাশে কিভাবে বাধা প্রদান করছে- তা একটু আলোচনা করা দরকার। আমাদের ভাষা নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা বা পক্ষ-বিপক্ষে তর্ক হয়েছে কাজ কতটুকু হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। যত আলোচনা হয়েছে, তত মত বেরিয়েছে। ‘আলালী-হুতোমী’ ভাষা নিয়ে যারা একদিন বিদ্রূপ করেছিল আজ তারা ইতিহাস। আলালী-হুতোমী ভাষার জয়যাত্রার যুগেও আমরা এখনও ভাষায় গুরুচণ্ডালী দোষ খুঁজে বের করতে সদা ব্যস্ত। তাছাড়া আমরা আমাদের ভাষার বানানরীতি নিয়েও আমরা সবাই একমত নই। যুক্তাক্ষরগুলি পাঠ্যপুস্তকে একরূপ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত বই ও লেখায় ভিন্নরূপ। একেক সময় একেক বিধান করে আমরা আমাদের ভাষাকে কঠিন থেকে কঠিনতর দিকে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা জানি, কোন ভাষায় বেশী বর্ণ ও অক্ষর থাকলে তা সে ভাষাকে কঠিন করে তোলে। এক্ষেত্রেও আমরা অধিক বর্ণ ও অক্ষরের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছি ও পড়ছি। আবশ্যক নয় এমন অক্ষরগুলোর ব্যাপারে আমরা যদি এখনই না ভাবি, তাহলে ভাষার ক্ষেত্রে যে সবসময় গোলমেলে অবস্থানে থাকবো তা নিশ্চিত। যে ভাষা সহজ-সরল ও দ্যর্থকতামুক্ত তার দ্বারা ভালভাবে চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারি। ভাষার জটিলতা বা দ্ব্যর্থকতা অনেক সময় আমাদের চিন্তার বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা চিন্তাকে বেশী গুরুত্ব না দিয়ে ভাষার গঠনশৈলী ও রীতি নিয়ে অযথা বিতর্ক করেছি বা করছি।

ভাষাকে সহজ-সরল চিন্তার প্রক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করে ভাষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মত পরিহার করে এমন একটা রীতি প্রণয়ন করা দরকার যা আমাদের সঠিক চিন্তার সহায়ক হবে। আমরা ভাষাকে চিন্তার সহজ-সরল মাধ্যম হিসাবে পেতে চায়। অযথা ভাষা-চাতুর্য পরিহার করে গণ-মানুষের উপযোগী ভাষা-রীতি প্রণয়ন করা আজ সময়ের দাবী।

ভাষা যদি চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম হয় তাহলে এখনই ভাষাকে সহজ-সরল করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা জরুরী। আমরা যদি আমাদের ভাষাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসাবে ব্যবহার করতে চাই তাহলে এখনি বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার। আমাদের সব সময় মনে রাখা দরকার, ভাষা চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম, তাই চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন কিছু এখনই ভাষা থেকে ছেঁটে ফেলা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তা না হলে ভাষা ও চিন্তার গোলমেলে ফাঁদে আমরা আটকে থাকবো গোলকধাঁধার মত।

[লেখায় যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তা ইন্টারনেট থেকে নেওয়া]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।